বহু পুরানো দিনের কথা ,  বয়সটা  মাত্র ৬  । গ্রামের ছেলে আমি , বড় হয়েছি গ্রামে ,  এখনকার মতো ৪ বছর হলেই বাবা মা ব্যাস্ত হয়ে উঠতেন না  স্কুলে ভর্তি করবার জন্যে। হুট করে  আব্বা একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন , নাম তার সেন্টু স্যার । আমাকে বলা হলো " উনি তোমার নানা , উনার সাথে যাও , চুপ করে থাকবা কিন্তু কোন রকম দুষ্টামি করবা না " সাথে হাতে পেলাম একটা শিলেট আর একটা চক। উনি নিয়ে গেলেন আমাকে একদম অপরিচিত একটা জায়গায় নাম তার হচ্ছে " স্কুল " । আমি নাকি "ছোট ওয়ানের " ছাত্র ।  আমার সেন্টু নানা কে দেখি সবাই বলে স্যার । আমি ও তখন একটু করে বুঝতে পারলাম উনি আমার স্যার , কিন্তু আব্বুতো বলেছে " উনি আমার নানা " তাহলে কেমন করে কি হবে ? ভাবনার সাগরে হারিয়ে গেলাম , ভাবতে ভাবতে  বাড়ি এলাম, আম্মুকে জিজ্ঞাস করি " আম্মু উনি তো আমার নানা , কিন্তু সবাই বলে স্যার " আমি এখন কি করবো  ? ' আম্মু বললেন 'উনি তোমার স্যার , উনাকে সব সময় সম্মান করবে , ভালো করে কথা বলবে, সালাম দিবে দেখা হলেই " ।  হয়তো এই জায়গা থেকেই আমার শুরু হয়েছিলো মুল্যবোধের শুরু । আমি শিখেছিলাম আমার মায়ের কাছে বড়দের কেমন করে সম্মান করতে হয় ? আজও আমার মায়ের শিক্ষা আমার কাছে সম্পদ। আমি আমার জীবনে যত বড় হয়েছি আমার বড়দের ততবেশি  শ্রদ্ধাশীল হয়েছি, সব সময় ভেবেছি আমি যদি খারাপ কিছু করি , আমার বাবা মা তা শুনলে কষ্ট পাবেন। খারাপ কিছু দেখলে সরে এসেছি । 

বয়স যখন ১৩ -১৪ প্রবল নেশা ছিল ক্রিকেট খেলাবার । সব কিছু ঠিক ছিল কিন্তু  যখন ক্লাস নাইনে উঠলাম তখন আবিস্কার করলাম বড় হচ্ছি। ছেলেমানুষি হারিয়ে যাচ্ছে । নতুন আকর্ষণ সৃষ্টি হচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকা হবার কারণে দিন দিন দেখতে পাচ্ছি আমার কাছের বন্ধুগুলা থেকে আমি দূরে যাচ্ছি , কারণটা খুঁজে বের করবার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখলাম, বেশিরভাগ বন্ধু বান্ধব মাদকের স্পর্শে চলে যাচ্ছে। অসৎ সঙ্গের জন্যে। আমাকে ডাকে,  আমি ভাবি "বেশ ভালোই তো বড় হচ্ছি , নেশা না হলে কি বড় হয় নাকি মানুষ" কিন্তু সমস্যা , যাচ্ছি বন্ধুদের সাথে কিন্তু অজানা এক কারণে আমি ওদের থেকে আবার দূরে সরে যাচ্ছি, আবার ও কারণ খুঁজে শুরু করলাম, বিষয়টা হচ্ছে আমার মস্তিস্ক আমাকে বলছে " তুমি এইটা করলে তোমার বাবা মা কে সবাই খারাপ বলবে, তাদের নাম খারাপ হবে " আমি সব দিক ভেবে ওইদিকে যাবার আগেই অনেক দূরে সরে এলাম। শুরু হল বন্ধুদের সাথে দুরুত্ব । আস্তে আস্তে একা হয়ে গেলাম কিন্তু নিজের "মূল্যবোধ" এর কারণে নিজেকে খারাপ হতে দিতে পারি নাই। 

অচেনা শহর ঢাকা , হুট করে এসে এমন একটা জায়গায় উঠলাম , সব সময় দেখি এলাকার সব বড়ভাই , আর গন্যমান্য ব্যাক্তিদের সময় কাটানোর জায়গা। বড় হয়েছি পকেটে টাকা আছে।  দিন যায় নতুন ধারণা আসে নিজের ভিতর। আস্তে আস্তে এই কাঠ পাথরের শহরে চলতে গিয়ে বুঝলাম অনেক কিছুই আছে যার সাথে তাল না মিলালে হয়তো এই শহরে চলা যাবে না। চাকরি করতে গিয়ে বাঁধা , চলতে গিয়ে বাঁধা। সব জায়গায় মূল্যবোধ এর চরম অবক্ষয় ।  চাইলে সব কিছুর উপর গা ভাসিয়ে দিয়ে  ইনাকাম করতে পারতাম  অনেক টাকা, হতে পারতাম অনেক খারাপ। কিন্তু যত বার চেষ্টা করেছি ততবারই ওই " মূল্যবোধ ' তাড়া করেছে নিজের ভিতরে। হতে পারি নাই খারাপ। 

জীবনকে নিজেছি চ্যালেঞ্জ হিসেবে।  সরে আসলাম সব কিছু থেকে শুরু করলাম নিজেকে কিছু বানানোর জন্যে যুদ্ধ । দিন যায়  রাত যায়  , কই সফলতা তো আসে না ? কষ্ট হয় মানুষের কাছে কটু কথা শুনি " ইলেকট্রিক্যালে  ইঞ্জিনিয়ারিং  ডিগ্রি " নিয়ে কেন এতো ভালো জব বাদ দিয়ে আজকে ডিজাইনার হতে চাও ? অনলাইন থেকে আবার ইনকাম হয় নাকি ?   আস্তে আস্তে শুরু করলাম নিজেকে একটু একটু করে গুছানো । আজকে ৪ বছর পর আমি  আমার নিজের মনে হয় আমি পেয়েছি আমার গতিতে। 

আমি খুব ছোট মানুষ হয়ে বলতে পারি আজকে যদি আমাদের সমাজে  মূল্যবোধ এর অভাব  থেকে থাকে ?  আমরা যদি প্রশ্ন তুলি ? তবে অবশ্যই আমাদের নিজেদেরকে সতর্ক হতে হবে। কারন আমার মতে মূল্যবোধ  এর শুরুটাই হয়,  আপনার ঘর থেকে। আজকের শিশু শিখে তার আপন  ঘর থেকেই। বাসার পরিবেশ দেখেই। বাবা কেমন মা কেমন তা  দেখেই। আজকে আপনি যদি সতর্ক থাকেন,  তাহলে আপনার শিশু কোন দিন ও বিপথে যাবে না। তাকে যদি ছোট থেকেই শিখান নকল না করে পরীক্ষা দেবার , তাহলে সে কোনদিন ও এইসবে অভ্যস্ত হবে না। একটা নির্দিষ্ট সময়ে তুলে দেন মোবাইল, ইন্টারনেট । খেয়াল রাখুন তার চাহিদার প্রতি। সময় দেন তাকে। সে যদি আজকে বোম্বের নায়িকা আর রক সংগীত দেখে বড়  হয় তাহলে তো সে কেমন করে আব্দুল আলিমকে চিনবে কিংবা চিনবে তার নিজের দেশকে  ? আপনি তাকে যদি সব সময় নিউ ইয়ার্ক সিটি দেখান তাহলে , সে কেমন করে আপনার গ্রাম চিনবে ?  তার মূল্যবোধ তো হবে ওয়েস্টার্ন ধাঁচের । আমার মতে মনে হয় আমারা যেমন ভাবে বড় হয়েছি, আমাদের সন্তানদের অধিকার রয়েছে সেই আমেজ পাবার। আজকে  তাকে আপনি বইয়ের বিদ্যা ঠুসে ঠুসে ধুকিয়ে স্কলার না বানিয়ে , বানান চোখ কান খোলা একজন ভালো মানুষ । যার ভিতর থাকবে বড়দের জন্যে শ্রদ্ধা, মানুষের প্রতি দয়া । আর থাকবে সবার তার প্রতি দোয়া। দেখবেন তার জীবনে সফলতা অন্যদের থেকে অনেক বেশি। 

আশা করি আমার লেখা সবার ভালো লাগবে। কেউ যদি আমার লেখাতে কষ্ট পেয়ে থাকেন আমি বিশেষভাবে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি । 

ধন্যবাদ সবাইকে

দিপু

ওপেন এক্সেস বাংলাদেশ     

Shuvra Kar
Open Access Bangladesh Copyright © 2017
Developed by: Orangebd